আগামী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জ্বালানি সরবরাহ

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে

দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি জ্বালানি। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জ্বালানির একটি বড় অংশই এখন আমদানিনির্ভর।

দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি জ্বালানি। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জ্বালানির একটি বড় অংশই এখন আমদানিনির্ভর। বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির বড় অংশই আসে আমদানি করা কয়লা, তেল ও গ্যাস থেকে। স্থানীয় গ্যাস সরবরাহ দিন দিন কমছে এবং জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, গত ১০ বছরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কমেছে। এখন সেই ঘাটতি আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। স্থানীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোয় উৎপাদন হ্রাস পাওয়া, নতুন অনুসন্ধান না হওয়া এবং বাপেক্সের সীমিত সক্ষমতার কারণে এ ঘাটতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলো গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর কোনোটি এখনো প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। অন্যদিকে আমদানীকৃত গ্যাসের ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। দেশের বিদ্যমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ১০০ কোটি ঘনফুট। এ সীমিত সক্ষমতার কারণে বেশি গ্যাস আমদানি করা সম্ভব নয়।

ফলে দেশ এখন এমন এক দ্বিমুখী সংকটে আটকে যাচ্ছে, যেখানে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন কমছে। আবার অর্থনীতির বহিঃ ঝুঁকিগুলোর কারণে আমদানি নির্ভরতা বাড়ানোও বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান নয়। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার কারখানাসহ সব খাতেই গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরো বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচিত সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে এখনই অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক নীতি গ্রহণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় উৎপাদন কমতে থাকা এবং আমদানির সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি করবে।

রাজধানীতে গত বুধবার ‘পাওয়ারিং প্রসপারিটি: ক্রিয়েটিং আ স্ট্যাবল অ্যান্ড ব্যাংকেবল এনার্জি ফিউচার ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক বলেন, ‘২০২৯ সালে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ৩৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে। তাই এখন থেকে নতুন বিনিয়োগ না করলে ২০৩১ সালে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে। বর্তমানে দেশের বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার ৪৮ শতাংশ আছে বেসরকারি খাতের হাতে। তাই নতুন নীতি তৈরিতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।’

বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই যেহেতু বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল, তাই ভবিষ্যতের নীতি প্রণয়নেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। কিন্তু নীতির স্থিতিশীলতা ছাড়া বেসরকারি খাত নতুন বিনিয়োগে এগোবে কেন? বছরের পর বছর বিনিয়োগকারীরা নীতি অনিশ্চয়তা, চুক্তির জটিলতা, ট্যারিফ নির্ধারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে নিরুৎসাহিত হন। তাই সরকারকে প্রথমেই এ প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে।

বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং জ্বালানি খাতে সংকটের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় বিগত দেড় দশকে বিপুল পরিমাণ দায়দেনা করে আওয়ামী লীগ সরকার। দরপত্র ছাড়াই এককভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং গ্যাস অনুসন্ধান না করে এলএনজি আমদানির কারণে চলে যায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। দেশ পড়ে তীব্র আর্থিক সংকটে। আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সংস্কারের বড় প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গত এক বছর চার মাসেও কিছু আইনি সংস্কার এবং বকেয়া পরিশোধ ছাড়া সরকার এ খাতের আর্থিক চাপ কমাতে তেমন কোনো পরিকল্পনা নেয়নি। তৈরি করতে পারেনি টেকসই রূপরেখা। বিশেষ করে ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং গ্যাস সংকটে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে এ খাত পরবর্তী সরকারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করবে।

দীর্ঘ দুই দশক ধরে বাপেক্সের ওপর নির্ভরতা দেশকে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। দেশীয় দক্ষতা ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়ায় গ্যাস উৎপাদন কমছে ও আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানকারী কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করা ছাড়া বাস্তবসম্মত সমাধান নেই। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। অর্থাৎ সংকটকে আরো জটিল করছি আমরা। জ্বালানিনির্ভর শিল্পায়ন, কৃষি, পরিবহন ও নগরায়ণের সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন জড়িত। ফলে যেকোনো ধরনের সরবরাহ সংকট শুধু উৎপাদন ব্যাহত করবে না; বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে অপরিকল্পনা ও একচেটিয়া অর্থ লোপাটের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে। তার জন্য ২০১০-১১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিদ্যুতেই শুধু ভর্তুকি দিতে হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে গত অর্থবছরেই দেয়া হয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। এদিকে গ্যাস খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণে দেশে বৃহৎ আকারে গ্যাসের কোনো জোগান তৈরি করা যায়নি। গ্যাস নেই এমন ধারণা থেকে বিগত সময়ে স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন কোম্পানি বাপেক্সকে একপ্রকার অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল। বিপরীতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। এ পর্যন্ত পণ্যটি আনতে গিয়ে ২ লাখ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অন্যদিকে গত দুই দশকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ করা হয়েছে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা।

আমদানি কমিয়ে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে হাতে নেয়া হয়েছে কূপ খননের বড় প্রকল্প। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আবিষ্কৃত গ্যাস গ্রিডে আনার জন্য যে পরিকল্পনা প্রয়োজন তা চলছে আগের নিয়মেই। ফলে স্থানীয় গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ায় এখনো বড় আকারে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে এসব বিষয়ের টেকসই ও পরিকল্পিত সমাধান না হলে পরবর্তী সরকারের অর্থনৈতিক বড় বোঝা তৈরি হবে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহেও তৈরি করবে সংকট। যদিও সরকার বলছে, বিদ্যুৎ খাতের মৌলিক যে সংস্কার তা শুরু করা হয়েছে। সেগুলোর প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে।

ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানির চাহিদা কমবে না, বরং বাড়বে। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়নের বিস্তার, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও জীবনমানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেক গুণ বাড়বে। এ বাস্তবতায় সরকারকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা; দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো; তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি কাঠামো তৈরি করা। তাৎক্ষণিক বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

তবে আমদানিনির্ভর জ্বালানির বহুমুখী ঝুঁকি রয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির, পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত। ঠিক এ কারণেই বাংলাদেশকে দেশীয় জ্বালানিনির্ভরতার দিকে অগ্রসর হতে হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা যত বাড়বে, জ্বালানি–সংকট তত ঘন ঘন দেখা দেবে ও ব্যয়ও বহুগুণ বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি বা জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে সংকটে ফেলবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমরা কি আগাম প্রস্তুতি নিতে চাই, নাকি সংকট তৈরি হওয়ার পর তড়িঘড়ি সমাধান খুঁজতে চাই? আগের অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি হলে দেশের অর্থনীতিকে মাশুল দিতে হবে। বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি কৌশল তৈরি করতে হবে। এ কৌশল হতে হবে তথ্যভিত্তিক, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধাননির্ভর, বিনিয়োগবান্ধব ও পরিবেশসম্মত। কারণ দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিল্প ও রফতানি—সবকিছুই নির্ভর করছে নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহের ওপর। জ্বালানি খাত বড় আকারে আমদানিনির্ভর হলে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিজস্ব জ্বালানি উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারকরা যদি সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে বর্তমান চ্যালেঞ্জই নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

আরও